ইভ্যালি যে ব্যবসায়িক পদ্ধতি অনুসরণ করে শূন্য থেকে সাফল্যের চূড়ায় পৌঁছেছেন

ইভ্যালি বাংলাদেশের জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট গুলোর একটি। ই-কমার্স ওয়েবসাইট গুলোর মধ্যে ২০১৯ সালে বাংলাদেশে ৬৭.৮% শেয়ার নিয়ে প্রথম স্থানে ছিল দারাজ এবং ২১.৩% শেয়ার নিয়ে দ্বিতীয় স্থানে অবস্থান করছিল ইভ্যালি। সিমিলার ওয়েবসাইট থেকে পাওয়া তথ্যমতে ২০২০ সালের অক্টোবর মাসে ইভ্যালির ওয়েবসাইটে মোট ভিজিটর ছিল প্রায় ৫৯ লক্ষ। অন্যদিকে একই মাসে দারাজের ভিজিটর ছিল প্রায় ৪৬ লক্ষ। এ সকল দিক থেকে বিবেচনা করলে বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ই-কমার্স সাইট ইভ্যালি।

Evaly


ইভ্যালি প্রতিষ্ঠা

মোহাম্মদ রাসেল ২০১৮ সালে ইভ্যালি প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি একজন সাবেক ব্যাংকার। ২০১৬ সালে কিডস ডাইপার এর মাধ্যমে তিনি ব্যবসা শুরু করেন। অল্প সময়ের মধ্যেই এই ডাইপার খুব জনপ্রিয়তা লাভ করে। এই সাফল্যের পর তিনি একটি ই-কমার্স সাইট তৈরি করার পরিকল্পনা করেন। ২০১৮ সালে তিনি একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট তৈরি করেন যার নাম রাখা হয় ইভ্যালি।

$ads={1}

বাংলাদেশে থ্রিজি প্রযুক্তি আসার পর থেকেই ই-কমার্স সাইটগুলোর জনপ্রিয়তা বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশে বর্তমানে ছোট বড় ১৩০০টি ই-কমার্স কোম্পানি রয়েছে। এছাড়াও ৫০ হাজারের বেশি মানুষ সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যমে ই-কমার্স এর সঙ্গে যুক্ত রয়েছে। যে সময়টিতে দারাজ এবং অন্যান্য ই-কমার্স সাইটগুলো জনপ্রিয় হয়ে উঠেছিল ঠিক সে সময়ই ইভ্যালির আগমন ঘটে। প্রথমদিকে ইভ্যালি অল্প কিছু কর্মচারী নিয়ে যাত্রা শুরু করে। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার কিছুদিনের মধ্যেই ইভ্যালি বেশ জনপ্রিয়তা লাভ করে।

ইভ্যালির উত্থান

ইভ্যালি ২০১৯ সালে তাদের বেশ কিছু বড় অফার নিয়ে প্রচারণা চালাতে থাকে। ইভ্যালি অফলাইন এবং অনলাইন দুইভাবেই তাদের কোম্পানির প্রচুর প্রচার করে। তাদের কার্যক্রম শুরু করার কিছুদিন পরেই ফেসবুক গ্রুপ খোলা হয়, যার সদস্য সংখ্যা তিন মাসের মধ্যে ৪৫ হাজার ছাড়িয়ে যায়। সে বছরই আগস্ট মাসে তারা ইভ্যালি মোবাইল অ্যাপ ছাড়ে যেটি পরবর্তী দুই মাসে প্রায় ৫০,০০০ এর বেশিবার ডাউনলোড করা হয়।

$ads={2}

২০১৯ সালের সেপ্টেম্বর-আগস্ট মাসে ইভ্যালি প্রায় ৬০ কোটি টাকার পণ্য বিক্রি করে। সেই বছর নভেম্বর মাসে প্রায় ৫০,০০০ অর্ডার পায় ইভ্যালি। ২০১৯ সালে দৈনিক গড়ে ১৫ হাজার মানুষ ইভ্যালির ওয়েবসাইট ভিজিট করে। বিশেষ অফার থাকাকালীন এর সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে যেত। ২০২০ সালে ইভ্যালির ব্যবহারকারীর সংখ্যা পূর্বের তুলনায় কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে।

শুরু থেকেই ইভ্যালি একটি পরিপূর্ণ ই-কমার্স ওয়েবসাইট হতে চেয়েছিল। তারা চেয়েছিল এমন একটি ই-কমার্স ওয়েবসাইট যেখানে সকল ধরনের পণ্য পাওয়া যাবে। বর্তমানে গাড়ি থেকে শুরু করে নিত্য ব্যবহৃত প্রায় চার হাজার জাতের পণ্য বিক্রি হয় ইভ্যালিতে। বর্তমানে কোম্পানিটিতে প্রতিমাসে গড়ে প্রায় ১০ লক্ষ পণ্য বিক্রি হয়। যার মূল্য ৩০০ কোটি টাকারও বেশি। বর্তমানে ইভ্যালির গ্রাহক সংখ্যা ৩৫ লাখেরও বেশি। ২৭ হাজারের বেশি বিক্রেতা ইভ্যালির মাধ্যমে নিজেদের পণ্য বিক্রি করে। প্রথমদিকে ইভ্যালি শুধুমাত্র শহরগুলোতে সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে সারা দেশে তাদের সার্ভিস রয়েছে।

ইভ্যালির ডেলিভারি পদ্ধতি

জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকায় ইভ্যালি বড় পরিসরে তাদের কার্যক্রম শুরু করে দিয়েছে। ইভ্যালি দেশের বিভিন্ন জায়গায় তাদের অফিস খুলেছে এবং বর্তমানে তাদের কর্মচারী সংখ্যা ১৫০০ এর বেশি। পণ্য ডেলিভারির কাজে নিয়োজিত রয়েছে ১৫ হাজার ডেলিভারি বয়। কোম্পানিটি বহু জনপ্রিয়তা পেলেও পণ্য ডেলিভারি দিতে দেরি হওয়ায় একে কিছু সমালোচনায়ও পরতে হয়েছে।

বাংলাদেশের বেশিরভাগ ই-কমার্স সাইট গুলোর নিজস্ব কোন দোকান নেই। কিন্তু ইভ্যালি অল্প কিছু সময়ে ঢাকার ১৩টি এলাকায় ২৬টি দোকান স্থাপন করে। বর্তমানে দেশের ২৫টি জেলায় ইভ্যালির ২০০টির বেশি দোকান রয়েছে। অ্যামাজনের পণ্য ডেলিভারি করার পদ্ধতিটি ইভ্যালি অনুসরণ করে। এক্ষেত্রে অর্ডার পাওয়ার পর পণ্যটি ইভ্যালি বিক্রেতা থেকে নিয়ে তাদের গুদামে আনে। গুদাম থেকে পণ্যটি ক্রেতার সবচেয়ে কাছের ইভ্যালির দোকানে নিয়ে যাওয়া হয়। যেখান থেকে ডেলিভারি বয় পণ্যটি ক্রেতার কাছে পৌঁছে দেয়।

ইভ্যালির প্রতিষ্ঠানসমূহ

ইভ্যালি তাদের ব্যবসা শুধুমাত্র ই-কমার্স এর মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি। ইভ্যালি এর কিছু সাব-ব্র্যান্ড ও রয়েছে। সেগুলো হলো ই-ফুড, ই-খাতা, ই-বাজার। ২০২০ সালের জুন মাসে ইভ্যালি তাদের ই-ফুড সফটওয়্যার প্রকাশ করে যার মাধ্যমে তারা ফুড ডেলিভারি সার্ভিস শুরু করে। শুরুতে উত্তরা এবং ধানমন্ডিতে সার্ভিস সীমাবদ্ধ থাকলেও বর্তমানে পুরো ঢাকায় ফুড ডেলিভারি দেওয়া হয়। তার সাথে ইভ্যালি চট্টগ্রামেও তাদের ফুড ডেলিভারি সার্ভিসটি চালু করেছে। বাজারে নতুন এসেই এরা ফুডপান্ডা এবং পাঠাওফুড কে ভালোই টেক্কা দিচ্ছে।

ইভ্যালির ব্যবসা পদ্ধতি

ইভ্যালি বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ ই-কমার্স প্রতিষ্ঠান হওয়ার স্বপ্ন দেখছে। তাই ক্রেতা এবং বিক্রেতা উভয়কে আকৃষ্ট করার জন্য ইভ্যালি বিভিন্ন সময় বিভিন্ন ধরনের ব্যবসায়িক পদ্ধতি অনুসরণ করে। বিভিন্ন অফার দেয়ার মাধ্যমে ইভ্যালি ক্রেতাদের আকৃষ্ট করে। ইভ্যালি ব্যবসা করার ক্ষেত্রে চাইনিজ কিছু বড় কোম্পানির ব্যবসা পদ্ধতি অনুসরণ করে। এই পদ্ধতিতে অনেকগুলো মানুষ একই পণ্য অনেক বেশি পরিমাণে কিনলে কোম্পানিটি সেই পণ্যের ওপর বড় ছাড় দেয়। ইভ্যালি বিশেষ ছাড় দেয়ার মাধ্যমে একটি পণ্যের বিপুল পরিমাণ অর্ডার সংগ্রহ করে। যার ফলে বিক্রেতা একটি বিশেষ মূল্যে ইভ্যালিকে পণ্যটি দিয়ে থাকে।

গ্রামাঞ্চলে ইভ্যালি

বাংলাদেশের বেশিরভাগ মানুষই গ্রাম অঞ্চলে বসবাস করে। প্রযুক্তির উন্নতির ফলে গ্রাম অঞ্চলের মানুষ ধীরে ধীরে ইন্টারনেটের সঙ্গে যুক্ত হচ্ছে। কেনার সামর্থ্য থাকলেও অনলাইনে কেনাকাটার সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত ছিল গ্রামের মানুষ। ইভ্যালি গ্রামাঞ্চলে ই-কমার্সের সুবিধা পৌঁছানোর ক্ষেত্রে বিশেষ ভূমিকা পালন করে। যার ফলে গ্রামের মানুষও ই-কমার্সের সুবিধা ভোগ করতে পারছে। এতে ইভ্যালিরও বিক্রি বেড়েছে।

গ্রাহকদের বিশ্বাস অর্জন

বাংলাদেশের মানুষ জাতিগতভাবেই আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। তাই গ্রাহকদের মনে জায়গা করে নিতে পারলে ব্যবসায় সাফল্য অর্জন করাটা সহজ হয়ে যায়। তাই শুরু থেকেই ইভ্যালির প্রতিষ্ঠাতা মোহাম্মদ রাসেল ফেসবুক লাইভে এসে নতুন নতুন অফার সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করতেন। ইভ্যালি সব সময় তাদের গ্রাহকদের কথা প্রথমে চিন্তা করে এই বার্তাটি তিনি সবসময় গ্রাহকদের কাছে পৌঁছে দিয়েছেন। এর ফলে সাধারণ মানুষের মনের মধ্যে তিনি জায়গা করে নিতে পেরেছেন। এছাড়াও কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা থেকে সরাসরি তথ্য পাওয়ার ফলে কোম্পানিটির উপর গ্রাহকদের বিশ্বাস বেড়েছে। এই বছর জুন মাসে ই-ফুড প্রকাশ করার পর কোম্পানির সিইও মোহাম্মদ রাসেল গ্রাহকদের কাছে গিয়ে সরাসরি খাবার ডেলিভারি করেছেন। তার এসকল কার্যক্রমের মাধ্যমে ইভ্যালির উপর গ্রাহকদের আস্থা দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।

ডিসকাউন্ট পদ্ধতি

অনেকেই চিন্তা করে ইভ্যালি এত বেশি ছাড় দেয় কিভাবে। ইভ্যালি বিশেষ কোনো ছাড়াও পণ্য বিক্রি করে। ইভ্যালির বিশেষ ডিসকাউন্ট দেয়া পণ্যগুলোর দিকে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে এগুলো বেশ কয়েক বছর আগের মডেল। অর্থাৎ নতুন পণ্যগুলোতে তাদের ছাড় দেয়ার বিষয়টি খুব কম দেখা যায়। নতুন পণ্যের জায়গায় করার জন্য বিক্রেতারা পুরনো পণ্যগুলো কম দামে কিন্তু অল্প সময়ে বিক্রি করে ফেলতে চায়। এ সুযোগটি ইভ্যালি ব্যবহার করে। তারা পণ্যগুলোর উপর বিশেষ ছাড় দেয় যার ফলে ক্রেতারা তাদের অফার দ্রুত লুফে নেয়।

উপসংহার

এই বছর ইভ্যালি কে নিয়ে বেশকিছু বিতর্কের সৃষ্টি হয়। যার ফলে কোম্পানির সিইও মোহাম্মদ রাসেল বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এসে বিতর্কিত সকল  প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন। সকল বিতর্কের অবসান ঘটিয়ে কোম্পানিটি এখনো গ্রাহকদের বিশ্বাস ধরে রেখেছে এবং প্রতিনিয়ত এর জনপ্রিয়তা আগের চেয়ে বৃদ্ধি পাচ্ছে।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন