ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্য যে কারণে নিঃশেষ হয়ে যায়

ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্য যে কারণে নিঃশেষ হয়ে যায়

Mughal


১৫২৬ সালে পানিপথের যুদ্ধে বিজয় লাভ করে দিল্লির সিংহাসনে বসেন মির্জা জহির উদ্দিন মুহাম্মদ বাবর। এর মাধ্যমে সূচনা হয় মুঘল সাম্রাজ্যের। পরবর্তী ৩০০ বছরের মধ্যেই ভারতবর্ষের বেশিরভাগ অংশ মুঘলরা নিজেদের অধীনে নিয়ে আসে। মুহাম্মদ বাবর প্রথমে ভারতবর্ষে লুটপাটের উদ্দেশ্যে আক্রম চালালেও পরবর্তীতে ভারতবর্ষের সমৃদ্ধি দেখে দিল্লিতে নিজের সাম্রাজ্যের স্থাপন করেন। মুঘলদের শাসনামলে ভারতবর্ষ সবচেয়ে বেশি উন্নতি লাভ করে। তখন ভারতবর্ষ সামরিক ও অর্থনৈতিক দিক দিয়ে ইউরোপের দেশগুলো থেকেও অনেক উন্নত ছিল। কিন্তু এই শক্তিশালী সাম্রাজ্য কিভাবে এবং কাদের জন্য নিঃশেষ হয়ে গেল তা নিয়ে আজকের লেখনি।

$ads={1}

মুঘল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে বাবর,আকবর এবং আওরঙ্গজেব এর শাসন আমলে। বাবর এর পরে তার ছেলে মির্জা হুমায়ুন মুঘল সাম্রাজ্যর সম্রাট হয়। কিন্তু তিনি সাম্রাজ্য বিস্তারে তেমন কোনো ভূমিকা রাখতে পারেনি। বরং শের শাহ সুরির আক্রমণে দিল্লি হাতছাড়া করেন। পরবর্তীতে তিনি দিল্লি উদ্ধার করলেও তার এক বছরের মাথায় তিনি মারা যান।

হুমায়ুনের মৃত্যুর পর তার ছেলে আকবর ১৪ বছর বয়সে দিল্লির সিংহাসনে বসেন। তার আমলে যেমন মুঘল সাম্রাজ্য বিস্তার লাভ করেছিল তেমনি উদারতার জন্য সাধারণ মানুষের মনেও জায়গা করে নিয়েছিলেন। আকবরের মৃত্যুর পর তার ছেলে জাহাঙ্গীর এবং জাহাঙ্গীর এর মৃত্যুর পর তার ছেলে শাহজাহান দিল্লির সিংহাসনে বসেন। কিন্তু তারা কেউই সাম্রাজ্য বিস্তার করতে পারেনি।

শাহজাহানের পর সম্রাট হয় তার ছেলে আওরঙ্গজেব। আওরঙ্গজেব এর শাসন আমলেই মুঘল সাম্রাজ্য সবচেয়ে বেশি বিস্তার লাভ করে। তার শাসন আমলে ভারতবর্ষ বিশ্বের সবচেয়ে ধনী দেশ হিসেবে জায়গা করে নেয়। সম্রাট আওরঙ্গজেবের পর তেমন কোনো যোগ্য শাসক দিল্লির সিংহাসনে বসেননি। মুঘল সাম্রাজ্যে পতনের সবচেয়ে বড় কারণ হল আওরঙ্গজেব এর পরবর্তী সম্রাট গুলোর অযোগ্যতা। আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর ১৫০ বছরে মোট ১১ জন সম্রাট দিল্লির সিংহাসনে বসেন। কিন্তু সম্রাট হিসেবে তারা কেউই নিজের যোগ্যতা দেখাতে পারেনি। বেশিরভাগ সম্রাটই সামরিক ও প্রশাসনিক কাজ থেকে দূরে থাকতেন। তারা বেশিরভাগ সময়ই তাদের বিলাসী জীবন-যাপনে মগ্ন থাকতেন।

$ads={2}

বাবর, হুমায়ুন, আকবর, জাহাঙ্গীর, শাহজাহান ও আওরঙ্গজেবের পর মুঘল সাম্রাজ্যে আর কোন যোগ্য সম্রাট পাওয়া যায়নি। রাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার উপর দাঁড়িয়ে থাকা মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা ছিল সম্রাট কে ঘিরে। সম্রাটের দক্ষতার উপর নির্ভর করত সাম্রাজ্যের উন্নতি-অবনতি। আকবর যেখানে তার সম্রাজ্য কে উন্নতির শিখরে নিয়ে গিয়েছিলেন সেখানে তাঁর উত্তরসূরি জাহাঙ্গীর ও শাহজাহান শুধুমাত্র সাম্রাজ্যে রক্ষার দায়িত্ব পালন করেছিলেন। শেষ যোগ্য শাসক আওরঙ্গজেব তার শাসনামলে কিছু ধর্মীয় নীতি গ্রহণ করেছিলেন। যার ফলে ভিন্ন ধর্মের প্রজারা বিদ্রোহ শুরু করেন এবং সাম্রাজ্যে বিশৃংখলার সৃষ্টি হয়।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর তার অযোগ্য উত্তরসূরিদের পক্ষে এইসব বিদ্রোহ দমন করা সম্ভব হয়নি। ফলে মুঘল সাম্রাজ্যের শাসন ব্যবস্থা রাজতান্ত্রিক হওয়ায় পরবর্তীতে সম্রাটদের অযোগ্যতার কারণে সম্রাজ্যে আরো বেশী বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়। যা সম্রাজ্য কে ধীরেধীরে পতনের দিকে নিয়ে গিয়েছিল। আওরঙ্গজেব নিঃসন্দেহে শক্তিশালী এবং সুশাসক ছিলেন। তার শাসনামল মুসলিমদের জন্য সুসময় হলেও তার কিছু ভুল সিদ্ধান্তের জন্য তিনি অমুসলিমদের সমর্থন হারায়। সাম্রাজ্যের বিভিন্ন জায়গায় বিদ্রোহ দেখা দেয়। একজন শক্তিশালী সম্রাট হওয়ায় তিনি এ বিদ্রোহগুলো দমন করতে পারলেও তার মৃত্যুর পর এই বিদ্রোহগুলো আরো বড় আকার ধারণ করে। ফলে দক্ষিনে মুঘলদের আধিপত্য দিন দিন কমতে থাকে।

মুঘল সাম্রাজ্যে কে হবে পরবর্তী সম্রাট তার জন্য কোন নির্দিষ্ট নিয়ম বা আইন ছিল না। যার ফলে যে ক্ষমতা দখল করতে পারত সে পরবর্তী সম্রাট হিসেবে নির্বাচিত হতো। তাই প্রত্যেক সম্রাটের মৃত্যুর পর একটি ভয়াবহ গৃহযুদ্ধ শুরু হতো যেখানে এক ভাই অন্য ভাইকে মেরে সিংহাসন দখল করত। জাহাঙ্গীর তার বাবা আকবরের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন একইভাবে শাহজাহান জাহাঙ্গীর এর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেছিলেন। আবার শাহজাহানের ছেলে আওরঙ্গজেবও বিদ্রোহ করে ক্ষমতা দখল করেন। এভাবে একের পর এক বিদ্রোহের ফলে সামরিক এবং অর্থনৈতিক দিক থেকে মুঘল সাম্রাজ্যে দুর্বল হতে শুরু করে।

মুঘল সাম্রাজ্য ছিল বিশাল। একটি সাম্রাজ্যের বিশালতা যেমন তার অহংকার তেমনি ডেকে আনতে পারে এর বিপর্যয়। সাম্রাজ্যে বড় হওয়ার সাথে সাথে পারিবারিক ষড়যন্ত্র বাড়তে থাকে। প্রত্যেক যুবরাজ এবং তার পরিবারের চোখ থাকতো সিংহাসনের দিকে। দেশের স্বার্থের বদলে এসময় ব্যক্তিগত স্বার্থই তাদের জন্য প্রধান হয়ে ওঠে। ষড়যন্ত্রের ফলে যুবরাজরা পরস্পরের বিরুদ্ধে যুদ্ধে মেতে উঠতো। উত্তরাধিকার যুদ্ধে ভাই-বোন থেকে শুরু করে আত্মীয়-স্বজনরাও নিজেদের সুবিধামতো বিভিন্ন পক্ষের যুক্ত হয়ে যেতেন।

সম্রাট শাহজাহানের রাজত্বকাল ঐশ্বর্যশালী ইমারতের জন্য পরিশুদ্ধ। কিন্তু এরকম মাত্রা অতিরিক্ত ব্যয় দেশের অর্থনৈতিক ব্যবস্থার উপর ছিল বিরাট এক বোঝা। শাহজাহানের রাজত্ব শেষে অর্থনৈতিক অবস্থা চরম পর্যায়ে পৌঁছায় এবং আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর গোটা সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক অবস্থা বেহাল হয়ে পড়ে। মুঘল সাম্রাজ্যে যুদ্ধ-বিদ্রোহ লেগেই থাকত। কখনো সাম্রাজ্য বিস্তারের জন্য আবার কখনো সিংহাসন দখলের জন্য। একের পর এক যুদ্ধ বিদ্রোহে ক্লান্ত হয়ে জনসাধারণের অনেকেই সম্রাটের প্রতি সন্তুষ্ট থাকতে পারিনি। অসন্তুষ্ট হয়ে পড়েছিল সৈন্যবাহিনীর সদস্যরাও।

স্থলভাগে মুঘলদের শক্তিশালী সৈন্যবাহিনী থাকলেও নৌখাতে তারা অনেক পিছিয়ে ছিল। মুঘলদের নৌশক্তির অভাবেই বিদেশী ব্যবসায়ীরা ভারতের রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ পায়। একটা সময় মুঘলদের সামরিক শক্তির এতটাই অবনতি ঘটে যে তারা বিদেশি শক্তির আক্রমণ থেকে নিজের দেশকে রক্ষা করতে হিমশিম খায়। বিভিন্ন যুদ্ধে সাহসী এবং দক্ষ সৈন্যরা একের পর এক মৃত্যুবরণ করেছিল। কিন্তু অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল হওয়ায় নতুন সৈন্য বাহিনী নিয়োগ দেয়া সম্ভব হচ্ছিল না। ফলে দিন দিন সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।

আওরঙ্গজেবের মৃত্যুর পর সম্রাজ্যে একতার অভাব স্পষ্ট হয়। সম্রাটদের অযোগ্যতা বুঝতে পেরে স্থানীয় প্রভাবশালী শক্তিগুলোর উত্থান ঘটে। এ সকল রাজ্যের সাথে একলা যুদ্ধ করতে করতে হাঁপিয়ে উঠে মুঘলরা। মুঘলদের দুর্বলতা বুঝতে পেরে বিদেশে শক্তিগুলো আক্রমণ করার সুযোগ খুঁজে পেয়ে যায়। পারস্য সম্রাট নাদের শাহ যখন দিল্লিতে আক্রমণ করে তখন মুঘল সাম্রাজ্য প্রায় পতনের দিকে। নাদের শাহ এবং আফগানিস্তানের সম্রাট আহমদ শাহ আবদালী বারবার আক্রমণ করে ছিন্ন-ভিন্ন করে ফেলে মুঘল সাম্রাজ্যকে।

নাদের শাহ এবং আহমদ শাহ আবদালী ভারতবর্ষে আক্রমণ করে প্রচুর লুটপাট চালায়। তাছাড়া বণিক হিসেবে ভারতবর্ষে প্রবেশ করলেও ক্রমে ইউরোপীয় গোষ্ঠীগুলো ভারতবর্ষের অর্থনৈতিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক ক্ষেত্রে জড়িয়ে পড়ে। এভাবে ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যায় ভারতবর্ষের সবচেয়ে শক্তিশালী মুঘল সাম্রাজ্য।

Post a Comment

নবীনতর পূর্বতন